রচনা: স্বাবলম্বন

ভূমিকা :
‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চল যে’
-রবীন্দ্রনাথ
মানুষের জীবনই অনন্ত শক্তির উৎস। নিজেকে সুন্দর করা, জাতি ও দেশকে মহান করে গড়ে তোলা মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের ব্রত। মানুষই দুর্বার প্রাণশক্তির আধার। এই মহৎ উপলব্ধিই তার ক্রমোন্নতির বীজমন্ত্র। অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের কাজ, নিজের বুদ্ধি, শ্রম প্রভৃতির সহায়তায় নিজের জীবন গঠনের চেষ্টাই হল স্বাবলম্বন। স্বাবলম্বনের সাধনা মানুষের আত্মশক্তিরই জাগরণ। কর্মই জীবন। কর্মই মানুষের জীবনকে নানা ঐশ্বর্য সম্ভারে ভরিয়ে দেয়। কর্মই মানুষের সৌভাগ্য-দেবতা। যারা পরনির্ভর, তাদের জীবন প্রতিপদে পঙ্গু। যারা অতিমাত্রায় অদৃষ্টবাদী ও দৈব শক্তিতে বিশ্বাসী, তারাও পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। দুর্বল অলস কর্মবিমুখ মানুষ কোনদিনও মানবিক গুণাবলির উন্মেষ ও বিকাশের সুযোগ পায় না। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, পরাণুগ্রহে পুষ্ট সেই জীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুঃখের আঁধার। তিল তিল করে সেই জীবনের হয় অপচয়। দুঃসহ বেদনাভার হতাশা-ব্যর্থতার অগৌরবে, গ্লানি ও উপেক্ষা নিয়ে এক দুর্লভ জীবনের ঘটে পরিসমাপ্তি।
স্বাবলম্বন মানুষের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যা অর্জন করতে হলে ব্যক্তিজীবনে আরও কিছু গুণাবলি অর্জন করতে হয়। কথায় বলে, যে শুয়ে থাকে তার ভাগ্যও শুয়ে থাকে। তাই পরিশ্রম ছাড়া স্বাবলম্বী হওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। আর যুগপৎ সন্নিবেশ ঘটবে- উদ্যোগ, উদ্যাম, নিয়মানুবর্তিতা, আগ্রহ, নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, শিষ্টাচার, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠার। তাই স্বাবলম্বী হওয়ার জন্যে এসব গুণাবলির অনুশীলন করতে হবে। মনে রাখতে হবে-
God helps those who help themselves.
কর্মই মানুষের সৌভাগ্যের কারিগর :
প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সুপ্ত থাকে শক্তির স্ফুলিঙ্গ। উপযুক্ত পরিবেশেই ভস্মাবৃত স্ফুলিঙ্গের অগ্নিশিখার দীপ্ত আত্মপ্রকাশ। মুহূর্তে অন্তরশায়ী সুপ্তিমগ্নতার অবসান ঘটে। কর্মনিষ্ঠা আর আত্মপ্রত্যয়ের আলোকশিখায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তার অন্তর্লোক। তখনই মানুষ খুঁজে পায় জীবনের অর্থ। তখনই তার জীবন ভরে ওঠে নানা সফলতায়। তখন আর সে পরমুখাপেক্ষী নয়। জাগ্রত চেতনার আলোকে দীপ্ত, দুর্জয় আত্মশক্তির অধিকারী সে। তখন তার কর্মবিমুখতার মোহাবরণ ছিন্ন হয়ে যায়। কর্মই মানুষের সৌভাগ্যের কারিগর। কর্মময় পৃথিবী মানুষকে নিয়ত ডাকছে। যে মানুষের কাছে সেই আহ্বান অশ্রুত থাকে, সেই মানুষই ভীত, অসহায়। ভাগ্যের হাতে নিজের জীবনকে সঁপে দিয়ে সে তখন খোঁজে বাঁচার ঠিকানা। অবাস্তব স্বপ্নচারিতা জীবনের অপচয়ের পথকে আরও প্রশস্ত করে।
স্বাবলম্বনের পথে বাধা :
শ্রমের মর্যাদাবোধের সঙ্গে আছে স্বাবলম্বনশক্তির নিবিড় সম্পর্ক। কোনো কাজই তুচ্ছ বা নিন্দনীয় নয়। দৈহিক শ্রমের কাজ কখনও অবজ্ঞা-উপেক্ষিত হতে পারে না। কেননা, ওই কাজের ওপরই নির্ভর করে আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, নির্ভর করে আমাদের অস্তিত্ব। আত্মশক্তির বিকাশেই স্বাবলম্বনের বিকাশ। এই শক্তির অভাবে হয় জীবনের বিনষ্টি। নিজের কাজ নিজের করার মধ্যে অমর্যাদার স্থান নেই, নেই অগৌরব। বরং, মর্যাদা দেওয়াই আধুনিক শিক্ষার অঙ্গ। সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে যখন সমাজবিকাশ দাস-শ্রমের ওপর নির্ভর করত, তখন শ্রমের কোনো মর্যাদা ছিল না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রম মর্যাদার আসন প্রতিষ্ঠিত। শ্রমের ওপর নির্ভর করেই সভ্যতার বিকাশ। কর্মশক্তির অভাব অনেক সময় স্বাবলম্বনের পথে বাধা। অনভ্যাসে শ্রম-শক্তি হ্রাস পায়। এভাবেও অনেকের মধ্যে পরমুখাপেক্ষিতা বৃদ্ধি পায়।
জগতে যাঁরাই বরণীয় পুরুষ, তাঁদেরই চরিত্রে স্বাবলম্বনশক্তির অমিত দ্যুতি। প্রবল পরাক্রান্ত সম্রাট নেপোলিয়ন প্রথম জীবনে ছিলেন সাধারণ সৈনিক। পরিশ্রম ও কর্মনিষ্ঠার বলে তিনি সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, গ্যালিলিও, নিউটন, গোয়টে, দান্তে প্রমুখ বিভিন্ন মনীষীর জীবনেও স্বাবলম্বনের শক্তিই উদ্ভাসিত। হযরত মহম্মদ, বুদ্ধ, যীশুখ্রিষ্ট এমনই কত মহৎ-প্রাণ, পরিত্রাতা জগৎ-গুরুর জীবনে আত্মশক্তিরই বিজয়-মহিমা। কর্মময় জীবনের মধ্যেই তাঁরা জীবনদেবতার আসন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
ছাত্রজীবনই হল স্বাবলম্বন শক্তি অর্জনের যথার্থ ক্ষেত্র। স্বাবলম্বনই ছাত্রজীবনে সাফল্যের সোপান। শুধুমাত্র চর্বিত-চর্বণ করে বা পরনির্ভরশীল হয়ে কখনও স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করা সম্ভব নয়। পঠিত বিষয় সম্পর্কে মৌলিক চিন্তাশক্তির জাগরণ ঘটায় স্বাবলম্বন-শক্তি। এই সময়ই প্রয়োজন স্বাবলম্বন-শক্তি অনুশীলন। মানুষ জীবনের প্রভাতে যে দুর্লভ গুণাবলি আয়ত্তের সাধনা করে, পরবর্তী জীবনে তারই সিদ্ধি। শিশু যেমন স্ব-চেষ্টায় চলার শক্তি সংগ্রহ করে, যেমন করে সে খেতে শেখে, রপ্ত করে কথা বলার কলাকৌশল, সেভাবেই মানুষকে ছাত্রাবস্থায় স্বাবলম্বন- শক্তিকে জাগ্রত করতে হয়। প্রথম থেকেই উপলব্ধি করতে হবে, সে মানুষ। তার মধ্যেই নিহিত আছে সৃষ্টি সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ। তারই মধ্যে সুপ্ত আছে অসীম অনন্ত শক্তি। স্বাবলম্বন সেই সুপ্তশক্তিরই জাগরণমন্ত্র। শৈশবই সেই পূজা-দেবী। তা না হলে ভবিষ্যৎ জীবনে তিলে তিলে ব্যর্থতা, হতাশায় মৃত্যু-বরণের দুঃসহ জ্বালা।
শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, সমাজ জীবনে, বৃহত্তর জাতীয় জীবনেও স্বাবলম্বন এক মহান ব্রত। এই ব্রত যে জাতির জীবনে সত্য হয়ে ওঠে, সেই জাতিরই সমৃদ্ধি আর সমুন্নতি। আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের দিকে তাকালে এ সত্য হৃদয়ঙ্গম হবে। এ দেশে প্রযুক্তি ও কারিগরি কাজে বিদেশিদেরই অবাধ অধিকার। বাঙালিরা সমাজজীবনে আজও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে নি বলেই অর্থনৈতিক জীবনে তার অনগ্রসরতার সকরুণ চিত্র দেখি। আজও যদি মানুষ কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়, যদি আলস্যনিদ্রায় গা ভাসায়, যদি সে শুনতে না পায় বিশ্বের দিকে দিকে প্রাণচঞ্চল কর্মের আহ্বান, যদি দেখতে না পায় বিশ্বজুড়ে বিপুল কর্মযজ্ঞের আয়োজন, তবে তার জীবনে বর্ষিত হবে অন্তহীন দুঃখ- দৈন্যের অভিশাপ। জাতীয় জীবনে শুধু সঞ্চিত হবে জড়ত্বের দীর্ঘশ্বাস। জীবনের অগ্রগতি হবে স্তব্ধ। কর্মই মানুষের একমাত্র পরিচয়, কর্মই তার যথার্থ অভিজ্ঞান। এরই মধ্যে রয়েছে মনুষ্যত্ব অর্জনের মন্ত্র। স্বাবলম্বন-শক্তিই সমাজজীবনে সফলতা ও সার্থকতার প্রেরণা।
স্বাবলম্বনে বংশ-গৌরবের কোনো মূল্য নেই। পৌরুষই মানুষের যথার্থ শক্তি। আর পৌরুষের ভিত্তিই হল স্বাবলম্বন। একে স্বীকার করেই কর্মী মানুষের অমরত্বের দুর্গম পথে অন্তহীন যাত্রী। আত্মশক্তির জাগরণের মানুষ লাভ করে বিরাটের সান্নিধ্য। উপলব্ধি করে দুর্জয় শক্তির মহিমা। যারা পেয়েছে এই অনন্ত শক্তির সন্ধান, দুর্গমতার পথেই তাদের নিত্য অভিসার। অন্যের অনুগ্রহ নয়, গলগ্রহতা নয়, নয় অপরের করুণা প্রার্থনা, আত্মশক্তিকে আশ্রয় করেই সে প্রতিকূলতার মধ্যে ঝাঁপ দেয়। এই পথেই সে জয় করে আনে সৌভাগ্যের দুর্লভ বিজয়মাল্য। কোনো ভয় বা ভীরুতার কাছেই সে নতজানু হতে জানে না। সে চির-উন্নত শির। হিমাদ্রিশিখরও তার কাছে নত-শির। কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতাই তার জয়যাত্রাকে রুদ্ধ করতে পারে না। স্বাবলম্বনই মানবজন্মের সার্থকতা, স্বাবলম্বনই তার যুগ-যুগান্তরের জীবন-সাধনা।