বিদ্রোহী কবিতার সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
-67476ae51c630.jpg)
Admin
November 28, 2024
617
বিদ্রোহী কবিতা ১৯২১ সালে লিখিত হয়েছিল, এ বিষয়ে দ্বিমত না থাকলেও রচনার সময়কাল নিয়ে কিছুটা দ্বিমত রয়েছে। বেশি সংখ্যক সাহিত্য সমালোচক 'বিদ্রোহী' কবিতা রচনার সময়কাল ১৯২১ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বলে মতামত দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তার রচিত 'কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সৃজন' গ্রন্থে লিখেছেন।
বিদ্রোহী কবিতা রচনার পটভূমি ও আঙ্গিক বিশ্নেষণ
১৯১৪ সাল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দাবানলে দাউদাউ করে জ্বলছে গোটা পৃথিবী। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন ব্রিটিশ শাসনে ও শোষণে ক্ষতবিক্ষত। কাজী নজরুল ইসলামের বয়স তখন ১৯ বছর সাত মাস। তিনি সেনাবাহিনীর এক তেজোদীপ্ত সৈনিক তখন। কুচকাওয়াজের সঙ্গে শত্রুকে ধ্বংস করার শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণে ব্যস্ত। প্রতিটি মানুষই যে বীরযোদ্ধা, অসম-সাহস ও শৌর্য-বীর্যের অধিকারী এ-বোধ তখনই সৃষ্টি হয়েছিল তার। আত্মসচেতন কবির মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল অদম্য সাহস। চিরস্পৃহা সৃষ্টি হয়েছিল, নিপীড়িত-নির্যাতিত, শোষিত-উপেক্ষিত বঞ্চিত মানুষের ব্যথা-বেদনামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার। যে-কারণে তিনি মানব সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে ওঠেন নিজে নিজেই। আর তখনই 'বিদ্রোহী' কবিতার মতো এমন কালজয়ী কবিতা সৃষ্টি হয়।
নজরুলের আমিত্ব
জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ অর্থে 'আমি' সংকীর্ণ চেতনার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু নজরুলের 'আমি' প্রথমত সমগ্র ভারতবাসীর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, এরপর সমগ্র পৃথিবীর পরাধীন জাতির কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। কারণ তিনি লিখেছেন-
'আমি উপাড়ি' ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে'
মুক্ত মানুষ মুক্ত স্বদেশ
মানুষ নিজের দাসত্বমুক্ত না হলে অন্যকে মুক্ত করতে পারে না। মন-দাসত্বমুক্ত হওয়া প্রথম প্রয়োজন। তিনি বারবার 'আমি' শব্দ ব্যবহার করে আমিত্ব প্রকাশ করতে চাননি; বরং ভারতীয় উপমহাদেশের দুর্বল-ভীরু মানুষকে বীরের জাতিতে পরিণত করার প্রত্যয়ে প্রতিটি 'আমি' ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন, এই সর্ব 'আমি' যদি স্বনিয়ন্ত্রিত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, যদি সমস্ত কুসংস্কার পিছুটানকে পশ্চাতে ফেলে নিজের মুক্তি কামনা করেন, তাহলেই প্রত্যেকে যথাযথ বীর হবেন। এ জন্য তিনি 'বিদ্রোহী' কবিতার প্রথম স্তবকেই মানুষকে বীর বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে লিখেছেন-
বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি' আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
সৃজনশীল প্রশ্ন নম্বর ১ এর উত্তর সমূহ
ক উত্তরঃ বিদ্রোহী’ কবিতাটি কবির ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা।
খ উত্তরঃ শােষকের অন্যায়-অনাচার অবসানকল্পে তার চলার পথের সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ‘বিদ্রোহী কবিতায় কবি নিয়ম-কানুন মানতে চান না।
বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নিজের শক্তির বহুমাত্রিকতাকে বিভিন্ন অনুষঙ্গে তুলে ধরেছেন।যারা মানুষের অধিকার হরণ করে এবং মানুষকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞিত করে তারা মানষের শত্র।
গ উত্তরঃ প্রতিদান কবিতার অনিষ্টকারীকে ক্ষমা করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার দিকটি উদ্দীপকের গফুর চরিত্রটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। 'প্রতিদান' কবিতার কবিভাবনায় সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও উদারতার দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। কবির যে অপকার করেছে, তাঁকে নানা বঘ্ননা দিয়েছে কবি তাকেই আপন করে নিতে চেয়েছেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে। কারণ কবি বিশ্বাস করেন প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসাই পারে পৃথিবীকে সুন্দর করতে।
উদ্দীপকের গফুরের সাথে কালামের সম্পর্ক ভালো না হলেও কালামের বিপদে সে-ই সবার আগে এগিয়ে আসে। গফুর নিজের ত্রাণ থেকে কিছুটা কালামকে দিয়ে সাহায্য করে। এতে তাদের মধ্যে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 'প্রতিদান' কবিতায় কবি অনিষ্টকারীকে কেবল ক্ষমা করেই নয় বরং প্রতিদান হিসেবে অনিষ্টকারীর উপকার করার মাধ্যমে পৃথিবীকে সুন্দর এবং বাসযোগ্য করতে চেয়েছেন। এ বিষয়টি উদ্দীপকের গফুর চরিত্রের মাঝেও ফুটে উঠেছে। তাই বলা যায়, গফুর চরিত্রটি 'প্রতিদান' কবিতার ক্ষমাশীলতা ও পরোপকারিতার আহ্বানকে ধারণ করে।
ঘ উত্তরঃ উদ্দীপকটিতে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মূলভাবের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। যুগে যুগে বহুবার এদেশের মানুষ শােষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। ন্যায্য দাবি আদায় করতে তারা রাজপথে মিছিল করেছে। শােষকের কবল থেকে মুক্ত হতে তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে।
উদ্দীপকে পশ্চিম পাকিস্তানের দুজন শাসকের ফাঁসির দাবিতে শিশুদের স্লোগানের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। এ দুজন হলেন আইয়ুব খান ও আবদুল মােনেম খান। এদের ফাঁসির দাবিতে শিশুরা আইয়ুব-মােনেম ভাই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই’ বলে স্লোগান দিয়েছে।
বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি সমস্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করেছেন। তার তীব্র প্রতিবাদী চেতনা তিনি অধিকারবতি সব মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন পৃথিবীতে যত দিন অন্যায় থাকবে, যত দিন উৎপীড়িতের কান্নার রােল তার কানে আসবে তত দিন তার বিদ্রোহ অব্যাহত থাকবে। এ চেতনাটি উদ্দীপকে প্রতিফলিত হয়নি। এ দিক বিচারে তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকটিতে ‘বিদ্রোহী কবিতার মূলভাবের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি।
বিদ্রোহী' কবিতায় এবং উদ্দীপকে যুগপৎভাবে অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার কথা বর্ণিত হয়েছে। মলত একটি আদর্শবোধকে কেন্দ্র করেই চালিত হয়েছে; আর তা হলো- সাম্যচেতনা ও ন্যায়। এ আদর্শকে ধারণ করেই ইমাম হোসেন এবং আলোচ্য কবিতার কবি বিদ্রোহ করেছেন। পরাজয়ের সম্ভাবনা জেনেও মানমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পিছপা হননি। অর্থাৎ, শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাঁরা ছিলেন আপসহীন। আলোচ্য কবিতার উদ্ভিটিতে এ ভাবাদর্শই প্রতিফলিত হয়েছে। সে বিবেচনায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।