রচনা : দেশভ্রমণ
-66937f48dbe8c.png)
Admin
June 27, 2024
466
ভূমিকা :
‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী-
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে।’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
দেশভ্রমণ মানুষের জীবনে আনে বৃহতের আহ্বান। আনে অজানা সৌন্দর্যের সংবাদ। অচেনার সান্নিধ্যে তার মনে লাগে বিস্ময়ের শিহরণ। ভুলে যায় প্রতিদিনের তুচ্ছতা। প্রয়োজনের পৃথিবী তাকে ধরে রাখতে পারে না। দেশভ্রমণের নেশা তাকে টেনে নিয়ে যায় প্রকৃতির অবারিত মুক্তাঙ্গনে। অজানাকে জানার জন্যে, অদেখাকে দেখার জন্যে; আমাদের পরিচিত গণ্ডির বাইরে অপরিচিত জগৎকে দেখার জন্যে- অন্তরের আকুল আগ্রহে আনন্দ অনুভব করি। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন-
‘Travelling makes one know the mystery of Lord’s creation. Travelling gets us self-confident.’
ভ্রমণের আনন্দ :
ভ্রমণের আনন্দের আকর্ষণই ভাইকিংদের ভেলায় ভাসিয়ে শ্বেত ভালুকের দেশ নোভাস্কাশিয়ায় নিয়ে গেছে, মার্কো-পোলো ভাসতে ভাসতে এশিয়ার বিস্তীর্ণ স্তূপ পেরিয়ে চীনে, ইবনে বতুতাকে ঘরছাড়া করেছে এশিয়া-আফ্রিকার দেশ থেকে দেশান্তরে। তাঁদের মনের গতির নেশায় বেজে উঠেছিল বিপুল সুদূরের ব্যাকুল বাঁশরীর মধুর ধ্বনি এবং সেই ধ্বনির কুহক হাতছানিতে দিগ্-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মায়াময় গৃহকোণ ত্যাগ করে অজানা পথে যাত্রা করেছিলেন। তাঁদের এই দুঃসাহসিক অভিযান মানবকুলকে ভ্রমণের নেশায় অনাদিকাল ধরে উদ্দীপ্ত করে যাবে।বৈচিত্র্যের নেশা :
দিনের পর দিন একই পরিবেশে জীবন-যাপন করে আমাদের মন বিষিয়ে ওঠে। আমরা তখন একটু বৈচিত্র্যের আস্বাদ পেতে চাই। দেশভ্রমণ সেই বৈচিত্র্য এনে দিয়ে আমাদের দেয় অপরিসীম আনন্দ। দেশান্তরিত পথিক যখন নতুন দেশের কোনো নতুন শহরে পদার্পণ করে তখন তাঁর কাচে মনে হয়- ‘আহা! কি সুন্দর।’ সুন্দর মনে যে সর্বদাই সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে তা নয়, নতুনত্বও হতে পারে একটা বিশেষ সৌন্দর্য, আনন্দ দেওয়ার একটা বিরাট কারণ। মার্কিন পরিব্রাজক যখন ইতালির কোনো ঘিঞ্জি শহরে পদার্পণ করে তখন তিনি এই নতুনত্বের আনন্দেই হন উদ্বেলিত।যেসব ব্যস্ত মানুষ সমুদ্রতীরে কোনো অচেনা রেস্তোরাঁয় ঢুকে পানীয়ের ফরমাশ দেন, তখন তাঁর মনে যে দৃষ্টির উদয় হয় সম্ভবত সেটা সাগরতলার কোনো রূপকথার রেস্তোরাঁ যেখানে পানীয় পরিবেশন করছে মৎস্যকন্যা। মরুভূমির শুষ্ক-শূন্যতা থেকে যখন কোনো আরব স্নিগ্ধ-শ্যামলিমার দেশ বাংলাদেশে পদার্পণ করেন, তখন তিনি অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করেন প্রকৃতির এই পূর্ণতা-এই বিস্ময়ই তাঁর আনন্দ। আবার তপ্ত মরুতে চোখ-ধাঁধানো মরীচিকা, বহু যোজন পরে আকস্মাৎ এক ঝরনাবিধৌত মরুদ্যান যে আনন্দ বয়ে আনতে পারে, ভ্রমণ-নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়া পথিকই তাঁর রস আহরণ করতে পারেন। তাই মনকে উৎসাহিত করার জন্যে দেশে দেশে চিত্তাকর্ষক পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা হচ্ছে।
শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে দেশভ্রমণ বা দেশভ্রমণের উপকারিতা :
দেশভ্রমণ শিক্ষার একটি প্রধান অঙ্গ। নানা দেশ ও সেখানকার মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে আমরা নানাবিধ অভিজ্ঞতা লাভ করি এবং সেই সঙ্গে নতুন নতুন জ্ঞান আহরণ করি। পৃথিবীর কত যে বিচিত্র স্থান আছে, তার বৈচিত্র্যের কথা বই পড়ে সবটুকু জানতে পারি না, চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার দ্বারা তা সম্পূর্ণ নতুনভাবে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। কত বিচিত্র দেশ, বিচিত্র তার অধিবাসী- আরো বিচিত্র তাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারা ও সামাজিক রীতিনীতি। দিকে দিকে কত অরণ্য-সমুদ্র-মরু-পর্বত। নিসর্গ প্রকৃতির কত অফুরান বৈভব, কত পশু-পাখি, জীবজন্তু। আমরা দেশভ্রমণের দ্বারা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেগুলোকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারি। ফলে দেশভ্রমণ শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পুঁথির ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। অধীত-বিদ্যা তাই আমাদের মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে না। মহৎ উপলব্ধিতে সেই শিক্ষা পূর্ণ ও সার্থক হয় না। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন,‘প্রত্যক্ষ বস্তুর সহিত সংস্রব ব্যতীত জ্ঞানই বলো, চরিত্রই বলো, নির্জীব ও নিষ্ফল হতে থাকে।’
তাই পুঁথির বিদ্যার সঙ্গে চাই বাস্তবের রাখীবন্ধন। আমাদের পঠিত ইতিহাস-ভূগোলই দেশভ্রমণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জাদুস্পর্শে হয়ে ওঠে প্রাণময়। মানুষে মানুষে তখন অনুভত হয় প্রাণের মিতালি। ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় ইতিহাসের কত অতীত কীর্তি, কত কাহিনী আমাদের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমরা যেন সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েও শুনতে পাই তার শাশ্বত বাণী। তাই দেশভ্রমণ না করলে শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শিক্ষার সঙ্গে তার নিক-সম্পর্ক। পাশ্চাত্য দেশে শিক্ষার সঙ্গে দেশভ্রমণের আত্মার সম্পর্ক। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে দেশভ্রমণকে শিক্ষার একটি অঙ্গরূপে প্রতিভাত করা হয় না। গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে যে শিক্ষা গ্রহণ করা হয় তার মধ্যে একটি সীমাবদ্ধতা আছে; কিন্তু গ্রন্থের বাইরে জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দ্বারা যে শিক্ষালাভ হয়, তা সীমাবদ্ধ নয়। এই শিক্ষার জন্যেই দেশভ্রমণের আবশ্যকতা অপরিহার্য।