বাংলাদেশের রুটির ঝুড়ি বলা হয় কাকে

বাংলাদেশের রুটির ঝুড়ি বলা হয় কাকে
Admin November 25, 2024 317

ইতিহাস

টাংগন, শুক ও সেনুয়া বিধৌত এই জনপদের একটি ঠাকুর পরিবারের উদ্যোগে ব্রিটিশ শাসনমলে বর্তমান পৌরসভা এলাকার কাছাকাছি কোনো স্হানে একটি থানা স্হাপিত হয়। এই পরিবারের নাম অনুসারে থানাটির নাম হয় ঠাকুরগাঁও থানা। "ঠাকুর" অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের সংখ্যাধিক্যের কারণে স্হানটির নাম ঠাকুরগাঁও হয়েছে।প্রাগৈতিহাসিক কালে সমুদ্রগর্ভে ছিল বাংলাদেশ নামের এই বদ্বীপটি। বিপুল জলরাশিতে নিমজ্জিত এই ভূখন্ডটি কালপ্রবাহে জেগে ওঠে। তবে এর যে এলাকাটি সমুদ্রের তলদেশ থেকে সবার আগে উঠে আসে তাহলো, হিমালয়ের পাদদেশ ও তার সংশ্লিষ্ট অঞ্চল।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষকরে বৃহত্তর দিনাজপুরের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্র গর্ভের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে তাই অনেক আগে। আর এজন্যই এই এলাকার মানুষ সভ্যতার পথে হাঁটতে শুরু করেছে অপেক্ষাকৃত আগে থেকেই। তাই প্রাচীন সভ্যতার কোনো নিদর্শন যদি খুঁজে পেতে চাই তাহলে তার সন্ধান করতে হবে প্রাচীন জনপদ ঠাকুরগাঁও ও সংলগ্ন এলাকাতেই। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ আবিষ্কৃত হয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের কাছাকাছি নেপালের রাজদরবার থেকে। নিশ্চয়ই নেপালীরা চর্যাপদের পদ রচনা করেন নি, রচনা করেছেন বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এবং তা অবশ্যই সংলগ্ন এলাকার কোনো মানুষ। কেননা সে সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ছিলনা বলে দূরের কোনো কিছু পাওয়া বা সংগ্রহ করা দুস্কর ছিল। তাই চর্যাপদ যে নেপালেরই কাছাকাছি কোনো বাংলা ভাষাভাষী এলাকার সম্পদ তাতে বোধহয় সন্দেহ থাকার কথা নয়। আবার দেখা যায় যে, ঠাকুরগাঁও ও সংলগ্ন এলাকার মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার যথেষ্ট মিল রয়েছে। চর্যাপদে বর্ণিত সমাজচিত্র থেকে এবং এলাকার বর্ণনা থেকে অনেক কিছুই পাওয়া যায় যার কারণে একে ঠাকুরগাঁও ও আশে-পাশের অঞ্চলের পদকারদের সৃষ্টি বলে ধরে নিতে খুব একটা অসুবিধা হয়না। এছাড়া গোরক্ষনাথ বলে চর্যাপদের যে পদকর্তা রয়েছেন তাঁর সঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের সংশ্লিষ্টতা অনেকেই সমর্থন করেছেন।  তথ্য প্রমাণের স্বল্পতার কারণে চর্যাপদের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও ও সংলগ্ন এলাকার সম্পর্কটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্যাপক গবেষণা ও অনুসন্ধান করা সম্ভব হলে অনেক তথ্য প্রমাণ সংগৃহীত হবে এবং তখনই এ ব্যাপারে যে সংশয় রয়েছে তা দূর হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।ঠাকুরগাঁও ও সন্নিহিত এলাকাকে চর্যাপদ রচনার এলাকা বলে রাষ্ট্রীয়ভাবেও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ঠাকুরগাঁও সম্প্রচার কেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে তদানীন্তন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আমাদের মাতৃভাষার সাহিত্যরূপের প্রথম প্রকাশও ঘটে ঠাকুরগাঁও এবং এর সন্নিহিত অঞ্চলে। এই ভূমিতেই রচিত হয়েছিল চর্যাপদের কয়েকটি পদ’’। কাজেই ঠাকুরগাঁও যে সুপ্রাচীন ইতিহাসে সমৃদ্ধ একটি জনপদ তা বলতে বোধহয় কোনো দ্বিধাই নেই।

ইতিহাস সমৃদ্ধ এই জনপদটিতে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতার বহু মূল্যবান সম্পদ। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সভ্যতার অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শনে পরিপূর্ণ ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে আছে অজস্র প্রত্নসম্পদ। মাটি খুঁড়লেই এখানে এখনো পাওয়া যায় প্রাচীন অট্টালিকার ধবংসাবশেষ সহ বহু মূল্যবান পুরাকীর্তি। কিন্তু পরিকল্পিত সংরক্ষণ, অধ্যয়ণ ও গবেষণা কাজের অভাবে বাংলার প্রাচীনতম জনপদ পুন্ড্র-বরেন্দ্রর কেন্দ্রস্থল ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস আজো অনাবিষ্কৃত আছে। আর্য আগমনের বহু আগে থেকেই এই ঠাকুরগাঁও অঞ্চলসহ সমগ্র বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় ছিল সভ্য মানুষের বসবাস। আর এই অনুমান যে অযৌক্তিক নয় তার প্রমাণ হলো, অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার বাণগড়ে বা কোটিবর্ষে (বর্তমানে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের গঙ্গারামপুরে) প্রস্তর যুগের বহু নিদর্শন প্রাপ্তি। এছাড়া অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার অংশ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের কাছাকাছি অবস্থিত কোটিবর্ষের সঙ্গে ভূমিগত দিক থেকে এ এলাকার কোনো তফাৎ নেই। সেখানে যদি প্রস্তর যুগের নিদর্শন পাওয়া যেতে পারে তবে স্বাভাবিকভাবেই ঠাকুরগাঁওয়েও এ ধরণের প্রত্নবস্ত্ত পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এখনো ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে পুকুর-দিঘি খননের সময় অসংখ্য প্রাচীন মূর্তি পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে পাথরের বুদ্ধ মূর্তি ও বিষ্ণু মূর্তির সংখ্যাই বেশি। ১৯৮৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর থানার রাজাগাঁও গ্রাম থেকে কিছু প্রাচীন মুদ্রা পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে ২১টি প্রাচীন মুদ্রা স্থানীয় ট্রেজারিতে জমা করা হয়। মুদ্রাগুলোতে যে লিপি খোদিত আছে তার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব না হলেও অনেকে অনুমান করছেন, মুদ্রাগুলো বৌদ্ধ কিংবা সুলতান আমলের। কিন্তু দু:খের বিষয় এই যে, মূল্যবান এই প্রাচীন মুদ্রাগুলো সম্পর্কে পরবর্তীতে আর কিছু জানা যায়নি। উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়নি এর গর্ভে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসকে। তাই বলা যেতে পারে যে ছড়িয়ে থাকা ও লুকিয়ে থাকা প্রত্ন সম্পদের উদ্ধার কাজের অভাবে এবং প্রত্নকীর্তির সংরক্ষণ, অধ্যয়ন ও গবেষণা কাজের অভাবে ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের সঠিক তথ্য আজো পুরোপুরি উদঘাটিত হয়নি। ফলে ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাস আজো রয়েছে অন্ধকারের গহবরে। তবুও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বিক্ষিপ্তভাবে ইতিহাস অনুসন্ধানের কাজ কিছু হয়েছে বলেই ঠাকুরগাঁওয়ের নিকট অতীতের বিক্ষিপ্ত ইতিহাসকথা শোনা যায় মানুষের মুখে মুখে। তবে তার সবটাই অসম্পূর্ণ, বিচ্ছিন্ন ও জনশ্রুতি নির্ভর।

আনুমানিক চার হাজার বছর আগে এই উপমহাদেশে আর্যদের আগমন ঘটে। তবে বাংলাদেশে আর্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় মাত্র ২২০০ বছর আগে। আর তা ঘটেছিলো সম্রাট অশোকের মাধ্যমে। সম্রাট অশোকের আগে কোনো আর্যশক্তি বাংলাদেশ অধিকারে সক্ষম হয়নি। কিন্তু যদি অশোককে আর্য বলে না ধরা হয় তবে বাংলার মাটিতে আর্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকে গুপ্ত আমলের। সম্রাট অশোক যে পুন্ড্ররাজ্য অধিকার করেছিলেন মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত ব্রাহ্মিক্ষিলিপিতে খোদিত শিলাখন্ডলিপি, ছাঁচে ঢালা ও ছাপযুক্ত মুদ্রা (Punch marked and cast coin) এবং এন.বি.পি পাত্রে তা প্রমাণ পাওয়া যায়। ঠাকুরগাঁওসহ বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় অশোকের আমলের কোনো প্রত্নকীর্তির চিহ্ন আজো পাওয়া যায়নি। তবে ঠাকুরগাঁও যে তদানীন্তন পুন্ড্ররাজ্যের অংশ ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অশোকের পরে বেশ কয়েকশ’ বছরের ইতিহাসের হদিস পাওয়া যায়না।

গুপ্তদের ইতিহাস সুস্পষ্ট। খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকে পুন্ড্ররাজ্য তথা বাংলাদেশ গুপ্তদের অধিকারে আসে। সে সময়ে দিনাজপুরের কোটিবর্ষ ছিল পুন্ড্ররাজ্য তথা বাংলাদেশের একটি বিষয়ে সদর দপ্তর। আর একটি বিষয়ে কেন্দ্রস্থল ছিল পঞ্চনগরী। এই পঞ্চনগরীর অবস্থান বর্তমান দিনাজপুর জেলার চরকাই, বিরামপুর, চন্ডীপুর ও গড় পিঙ্গলাই এলাকায় বলে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন। গুপ্ত আমলের বেশ কিছু তাম্রলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে বর্তমান দিনাজপুর জেলা থেকে। ফুলবাড়ি থানার দামোদরপুরে পাঁচখানা এবং হিলির বৈগ্রামে একখানা তাম্রলিপি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বৈগ্রামের তাম্রলিপিটি বেশ প্রাচীন। এটি সম্রাট কুমার গুপ্তের সময়ের (৪৪৭-৪৮ খ্রি:)। ঐতিহাসিক আ.কা.মো যাকারিয়া দিনাজপুর জেলায় গুপ্ত আমলের প্রাচীন কীর্তির নিদর্শন সমৃদ্ধ এলাকার নাম উল্লেখ করতে গিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল থানার নেকমরদের নামও উল্লেখ করেছেন। এ থেকে অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলায় গুপ্ত আমলের ইতিহাস ছড়িয়ে আছে।

১৭৯৩ সালে ঠাকুরগাঁও অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬০ সালে এটি মহকুমা হিসেবে ঘোষিত হয়। এর অধীনে ছয়টি থানা ছিল, এগুলো হলঃ ঠাকুরগাঁও সদর, বালিয়াডাঙ্গী, পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, হরিপুর ও আটোয়ারী। ১৯৪৭ সালে এই ৬টি থানা এবং ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার ৩টি থানা ও কোচবিহারের ১টি থানা (পঞ্চগড়, বোদা, তেতুলিয়া ও দেবীগঞ্জ) নিয়ে ১০টি থানার মহকুমা হিসেবে ঠাকুরগাঁও নুতনভাবে যাত্রা শুরু করে। কিন্ত ১৯৮১ সালে আটোয়ারী, পঞ্চগড়, বোদা, দেবীগঞ্জ ও তেতুলিয়া নিয়ে পঞ্চগড় নামে আলাদা মহকুমা সৃষ্টি হলে ঠাকুরগাঁও মহকুমার ভৌগোলিক সীমানা ৫টি থানায় সংকুচিত হয়ে যায়। থানাগুলি হচ্ছে: ঠাকুরগাঁও সদর, পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর। ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও মহকুমা জেলায় উন্নীত হয়।

এখানে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর (সাঁওতাল ও উরাও) মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে। জেলার নেকমরদ, রাণীশংকৈল এসব স্হানে সুপ্রাচীন সভ্যতার নির্দশন বিদ্যমান।

ঠাকুরগাঁও জেলার জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও এই জনপদের জনধারার বৈচিত্রের কারণে এখানে পরিদৃষ্ট হয় বহুমাত্রিক নৃ-বৈশিষ্ট্য। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি প্রধান ভাষাগোষ্ঠী ইন্দো ইউরোপীয়, দ্রাবিড় ও মুন্ডা ভাষার বিপুল সংখ্যক অধিবাসী এই জেলায় বসবাস করে। এছাড়া ‘বোডো’ ভাষা গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনসাধারণও এ জেলায় বসতি স্থাপন করেছে। ঠাকুরগাঁও জেলার জনধারার মধ্যে রয়েছে হিন্দু ও মুসলিম প্রধান জনধারা, সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, কোচ, পলিয়া, রাজবংশী, হো, মাহতো, মালো, কুকামার, হাড়ি, ভূঁইয়া, গাংখু প্রভৃতি। এই জনধারার মিশ্র রূপায়নেই গড়ে উঠেছে ঠাকুরগাঁও জেলার নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী মোটামুটি দীর্ঘমুন্ড, প্রশস্ত নাসা, আদি অস্ট্রেলীয় বা কোলিড; দীর্ঘমুন্ড, দীর্ঘ ও মধ্যোন্নতনাসা, মিশর-এশীয় বা মেলানিড এবং বিশেষভাবে গোলমুন্ড, উন্নত নাসা, অ্যালপাইন বা পূর্ব ব্র্যাকিড, এই তিন জনধারার সমন্বয়ে গঠিত।

নৃতত্ত্ববিদগণ প্রায় সকলেই এই অভিন্ন মত পোষণ করেন যে, নিম্নবর্ণের বাঙ্গালী এবং আদিবাসী উপজাতিদের মধ্যে আদি-অস্ট্রেলীয় জনধারার প্রভাব রয়েছে সবচেয়ে অধিক। বত্তুত, আর্য এবং জনধারা পশ্চিম দিক থেকে আগমন করলেও আদি অক্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠী অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আগমন করে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে মধ্য ও উত্তর ভারতে; এমনকি, এদের নতুন বসতভূমি বিস্তৃত হয় দক্ষিণভারত ও সিংহল পর্যন্ত। সিংহলের ‘ভেদ্দাপ্রতীম’ আদিবাসীরা পূর্বসূরী বাঙালীদের সমজাতীয় বলে অনেকের ধারণা। নৃতত্ত্ববিদ ফন আইকস্টেড বাংলাদেশের আদি অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর নামকরণ করেছেন ‘কোলিড’। ঠাকুরগাঁ জেলার জনধারার একটি বৃহৎ অংশ আদি-অস্ট্রেলীয় জনধারার অন্তর্গত। এদের নৃ-বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দীর্ঘ শিরাকার, প্রশস্ত নাক, নাকের গোড়া অক্ষিকোটর থেকে খুব উঁচু নয়, কপাল কিছুটা ভেতরের দিকে চাপা ও ভ্রুর হাড় কিছুটা উঁচু। মুখের নিম্নভাগ কিঞ্চিৎ লম্বা ধরণের। ঠোঁট যথেষ্ট মোটা। থুতনি কিছুটা কম উঁচু। মাথার চুল তরঙ্গায়িত ও কুন্ডলাকৃত। চুলের রং গাঢ় বাদামী থেকে কাল। দাড়ি গোঁফ মোটামুটিভাবে হয় কিন্তু দেহে লোমের পরিমাণ কম। গাত্রবর্ণ বাদামী থেকে ঘোরতর কালো। দেহাকৃতি খাট ও খর্বকায় (৫ ফুট ২ ইঞ্চি)। ঠাকুরগাঁ জেলার আদিম অধিবাসী, সাঁওতাল ওঁরাও এবং মুন্ডা জনগোষ্ঠী এই মানবধারার অন্তর্গত। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ঠাকুরগাঁয়ের আদিবাসী উপজাতি এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু মুসলমানের রক্তে এই জনধারার প্রভাব সবচেয়ে বেশী। কিন্তু এছাড়াও এই জনপদের কিছু কিছু উচ্চ বংশীয় জনসাধারণের মধ্যেও এই মানবগোষ্ঠীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

পামীর মালভূমি, তাকলামাকান মরুভূমি, আল্পস পর্বত (তুর্কী বা তুরানীর) দক্ষিণ আরব ও ইউরোপের পূর্বাঞ্চল বাসী গোলমুন্ড বিশিষ্ট একটি প্রবাহ বাংলাদেশের জনধারায় নিজেদের রক্তপ্রবাহ সঞ্চারিত করে। এই জনের সর্বপ্রাচীন সাক্ষ্য সংগৃহীত হয়েছে হরপ্পা ও ‘মোহেন জো-দারোতে’ প্রাপ্ত কংকাল থেকে। এই জনধারাকে নৃতত্ত্ববিদ লাপোং রিজলী লুসমান ও রমাপ্রসাদ চন্দ্র অ্যালপাইন নরগোষ্ঠী রূপে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের উচ্চবর্ণের ও উত্তম মিশ্র বর্ণের জনসাধারণের মধ্যে যাদের গোল ও মধ্যম মুন্ডাকৃতি তীক্ষ্ণ, উন্নত ও মধ্যম নাসাকৃতি এবং মধ্যম দেহ-দৈর্ঘ্যের লক্ষণ দেখা যায়, তা অনেকাংশে ‘অ্যালপাইন’, নরগোষ্ঠীরই দান। এই জনগোষ্ঠীর রক্তধারা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঠাকুরগাঁ জেলার ব্রাম্মন, কায়স্থ, বৈদ্যসহ উপরের বর্ণস্তরের লোকদের এবং উচ্চ শ্রেণীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিদ্যমান। বস্ত্তত বাংলাদেশে যে নৃবৈশিষ্ট্য ও সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে তার প্রায় সমগ্র মূল রূপায়নই প্রধানত ‘অ্যালপাইন’ ও ‘আদি-অস্ট্রেলীয়’ এই দুই জনধারার লোকদেরই র্কীতি।

‘বোডো’ ভাষাগোষ্ঠী বা মোঙ্গলীয় নরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোচ রাজবংশী, পলিয়া ইত্যাদি জাতির একটি প্রধান ধারা ঠাকুরগাঁ জেলায় পরিলক্ষিত হয়। এদের নৃবৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ: নাক মধ্যমাকৃতি থেকে চ্যাপ্টা; মাথার আকৃতি সাধারণত গোল; অক্ষিপট সম্মুখীন; উন্নত গন্ডাস্থি, কেশবিহীন দেহ ও মুখমন্ডল; চুল সোজা; দাড়িগোফ বিরল, গায়ের রং পিতাভ অথবা পিতাভ বাদামী। ৬এই জনগোষ্ঠী অতি প্রাচীনকালে দক্ষিণ পশ্চিম চীন হতে ক্রমশ: ব্রহ্মদেশ, মালয় উপদ্বীপ এবং পূর্ব দক্ষিণ সমুদ্র উপকূলীয় দেশ ও দ্বীপগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। পথে উত্তর আসামে এবং উত্তর ব্রক্ষ্মপুত্র উপত্যকায় মিরি, নাগা, ‘বোডো’ বা মেচ সম্প্রদায়ভূক্ত কোচ, পলিয়া, রাজবংশী প্রভৃতি লোকের মধ্যে একটি ধারা প্রবাহ ঐতিহাসিক কালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এসে ঢুকে পড়ে এবং রংপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি প্রভৃতি অঞ্চলে এভাবেই খানিকটা মোঙ্গলীয় প্রভাব সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের রক্তে আত্মপ্রকাশ করেছে। ঠাকুরগাঁ জেলার কোচ, পলিয়া, রাজবংশী উল্লিখিত জনধারারই উত্তরসূরী।

দীর্ঘ শিরাকার ও প্রশস্ত নাসা বৈশিষ্ট্যসহ আদি অস্ট্রেলীয় এবং মোঙ্গলীয় রক্তের মিশ্রণজাত আরো কয়েকটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এ জেলায় পরিদৃষ্ট হয় যেমন: মালো, মাহতো, ভূঁইয়া, হাঁড়ি, হো, কুকামার, গাংঘু প্রভৃতি।

ঠাকুরগাঁ জেলার প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী কারা, এ ব্যাপারে কোন তথ্যই আমাদের হাতে নেই। তবে স্থানীয় অধিবাসীদের শারীরিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরীখে এ ধারণা সহজেই গ্রহণ করা চলে যে, তাদের পূর্ব পুরুষগণের অনেকেই ছিলেন আদি অস্ট্রেলীয় নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বস্ত্তত, সাঁওতাল, ওঁরাও প্রভৃতি আদিবাসী প্রতীম জনগোষ্ঠী সরাসরি আদি-অস্ট্রেলীয় নৃজাতিভূক্ত হলেও ঠাকুরগাঁ জেলায় তাদের আগমন ঘটেছে অতি সাম্প্রতিক কালে। স্যার জি.এ গ্রীয়ার্সন ১৯০৬ সালে মালদা জেলার সাঁওতালদের সম্পর্কে বলেছিলেন যে, তারা এই জেলার পূর্বাঞ্চলে (অর্থাৎ দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁ অঞ্চলে) এসেছে বড় জোর ২০ বছর পূর্বে। মানববিজ্ঞানী পিয়েরে বেসাইনেত সাঁওতালদের আগমনের কারণ নির্দেশ করে বলেছেন যে, তারা বাংলাদেশের বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় এসেছিলো জমি পরিস্কার করে চাষাবাদের জন্য, মজুর হয়ে রেল লাইন বসাতে এবং অন্যান্য মজুর খাটার উদ্দেশ্যে। সুতরাং ভারতের দক্ষিণ বিহার, বীরভূম ও ছোটনাগপুর থেকে সাঁওতাল ও ওঁরাও জনগোষ্ঠীর ঠাকুরগাঁয়ে আগমন ও বসতিস্থাপনের সময়কাল ১৫০ বছরের বেশী কোন মতেই হতে পারে না। বস্ত্তত এই জনপদের বিপুল সংখ্যক জনসাধারণের আদি অস্ট্রেলীয় নৃজাতিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখিত আদিবাসী সূত্রে প্রাপ্ত নয়; বরং এই সংমিশ্রণ ঘটেছে হাঁড়ি, চন্ডাল শবর, শুদ্র প্রভৃতি নিম্ন বর্ণের মানুষদের কাছ থেকে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাগীতির শবর, ডোম ইত্যাদি নিম্নবর্ণের মানুষদের সমজাতীয়। এ অনুমানকে দৃঢ়িভূত করে এই জেলায় বসতি স্থাপনকারী প্রাচীন অন্যতম বিখ্যাত কবি গোরক্ষনাথের অস্তিত্বের বিষয়টি। শুধু গোরক্ষনাথই এ জেলায় জীবন যাপন করেছিলেন অন্য আর কোন চর্যাকার ছিলেন না, এ কথা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না। অর্থাৎ বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন থেকে এই জেলার প্রাচীন নৃগোষ্ঠীর সূত্র খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।

অ্যালপাইন জনগোষ্ঠী এই জেলায় আগমন করেছে মূলত অষ্টম-নবম শতক থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে। সাধারণত বহিরাগত জনগোষ্ঠীই এই জনধারার অন্তর্গত। গুপ্ত, পাল ও সেন রাজত্বকালে যেমন বহিরাগত হিন্দু মানবধারা এই জনপদে বসতি স্থাপন করেছে; তেমনি সুলতানী, তুর্কী ও মোগল শাসনামলে উত্তরভারতীয় মুসলিম জনধারাও এ অঞ্চলে আগমন করেছে।

বর্তমান ভারতের মালদা জেলায় অবস্থিত গৌড়, গুপ্তপাল ও সেন রাজত্বকালে ছিলো ঠাকুরগাঁ জেলার কাছাকাছি রাজধানী নগরী। একইভাবে বিশেষত সুলতানী আমলেও ‘গৌড়’ এ জেলার উপর সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। ঠাকুরগাঁ জেলার অন্তর্গত ভাতুরিয়া, রাণীশংকৈল প্রভৃতি অঞ্চল ‘গৌড়’ ও ‘তান্ডা’ রাজদরবার কর্তৃক শাসিত হয়েছে সরাসরি। রাজা গণেশ ছিলেন এ অঞ্চলেরই জমিদার ও পরে গৌড়েশ্বর ঠাকুরগাঁ জেলায় হিন্দু প্রাধান্যের পেছনে শত শত বছর যাবত নিকটবর্তী ‘গৌড়’ রাজধানী এবং তার শাসকদের আনুকূল্যে প্রবর্তিত হিন্দু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস অনেকাংশে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

সুলতানী আমলে গৌড় রাজ্যে উত্তরভারত ইরান, আরব ও আফ্রিকার হাবশী সৈন্য, কর্মচারী অজস্র সংখ্যায় আগমন করেছিলো। তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছে রাজধানী গৌড়ের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে। ঠাকুরগাঁ জেলা একই সঙ্গে ‘গৌড়’ রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত এবং রাজধানীর নিকটবর্তী। সুতরাং মুসলিম সৈন্য ও কর্মচারীরা এই জেলায় স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন সেটাই স্বাভাবিক। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, এ জেলার বৃহত্তর সুমলিম জনগণ নিম্নশ্রেণীর জনসাধারণ থেকে ধর্মান্তরিত, কিছু সংখ্যক মুসলিম বহিরাগত। এই বহিরাগত মুসলিমদের অধিকাংশই অ্যালপাইন নরগোষ্ঠীভূক্ত।

মোগল আমলে সম্রাট আকবর সুবেবাংলাকে যে ১৯টি সরকারে বিভক্ত করেছিলেন তার মধ্যে ‘সরকার তাজপুর’ ও ‘সরকার পাঞ্জারা’ ঠাকুরগাঁ জেলার সীমানভুক্ত। এছাড়া মোগল সামরিক অবস্থান ‘সরকার ঘোড়াঘাট’ ঠাকুরগাঁ অঞ্চলকেও নিয়ন্ত্রন করতো। সর্বোপরি দিল্লি থেকে গৌড় অথবা পূর্ব বঙ্গে যাতায়াতের পথে এ জেলার পার্শ্ববর্তী অবস্থান বহিরাগত প্রভাবও স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। এভাবেই ঠাকুরগাঁ জেলায় হিন্দু প্রাধান্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুসলিম প্রভাব।

ঠাকুরগাঁ জেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে-মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এবং বোডো ভাষা ব্যবহারকারী কোচ, পলিয়া ও রাজবংশী জনদের ব্যাপক সংখ্যায় বসতি স্থাপন।

জেলার নামকরণ

‘নিশ্চিন্তপুর’-নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিশ্চিন্তে বসবাসের উপযোগী কোনো গ্রাম বা জনপদের ছবি। কিংবা মনে পড়ে যায় বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাসের ‘নিশ্চিন্তপুর’ গ্রামের কথা। কিন্তু কখনো মনে পড়েনা উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের কথা। কেননা অনেকদিন আগেই চাপা পড়ে গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের এই নিশ্চিন্তপুর নামটি। কয়েকজন বিত্তশালী মানুষের খোয়ালী ইচ্ছাকে পূরণ করতে সাধারণের প্রিয় জনপদ নিশ্চিন্তপুরকে পাল্টে করা হয় ঠাকুরগাঁও। আর এ ইতিহাস অজানা রয়েছে বলে নিশ্চিন্তপুর শব্দটি উচ্চারিত হলে কখনো ঠাকুরগাঁওয়ের কথা মনে হয় না। তবে ইতিহাস সচেতন মানুষ আজো আবেগ শিহরিত হৃদয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুরের কথা মনে করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের নাম যে নিশ্চিন্তপুর ছিল তার তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এতদিন আমাদের হাতের কাছে ছিল না। জনশ্রুতি ও মৌজার নাম নিশ্চিন্তপুর হওয়ায় অনুমান করা হতো ঠাকুরগাঁও সম্ভবত এক সময়ে নিশ্চিন্তপুর নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি একটি মানচিত্র আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে যে ঠাকুরগাঁওয়ের আদি নাম ছিল ‘নিশ্চিন্তপুর’। ১৭শ শতাব্দীর কোচবিহারের মানচিত্রে সংলগ্ন এলাকার যে অবস্থান দেখানো হয়েছে তাতে ঠাকুরগাঁও ও নিশ্চিন্তপুর নামে দু’টি আলাদা জায়গা চিহ্নিত রয়েছে। টাঙ্গন নদীর পূর্ব প্রান্তে দেখানো হয়েছে নিশ্চিন্তপুর এবং এরই কিছুটা উত্তর-পশ্চিমে টাঙ্গন নদীর পশ্চিম প্রান্তে দেখানো হয়েছে ঠাকুরগাঁও। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে টাঙ্গন নদীর পূর্ব প্রান্তের নিশ্চিন্তপুরকেই পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও নাম দিয়ে সদরের নামকরণ করা হয়। আর এর মাধ্যমেই নিশ্চিন্তপুর রূপান্তরিত হয় ঠাকুরগাঁওয়ে। প্রথমে সমগ্র মহকুমা পরিচিত হয় ঠাকুরগাঁও নামে এবং পরে এরই ধারাবাহিকতায় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের পরিচিতি।ঠাকুরগাঁওয়ের নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে আর যা পাওয়া গেছে তা হলো, বর্তমানে যেটি জেলা সদর অর্থাৎ যেখানে জেলার অফিস-আদালত অবস্থিত সেখান থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে আকচা ইউনিয়নের একটি মৌজায় নারায়ণ চক্রবর্তী ও সতীশ চক্রবর্তী নামে দুই ভাই বসবাস করতেন। সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে তারা সেই এলাকায় খুব পরিচিত ছিলেন। সেখানকার লোকজন সেই চক্রবর্তী বাড়িকে ঠাকুরবাড়ি বলতেন। পরে স্থানীয় লোকজন এই জায়গাকে ঠাকুরবাড়ি থেকে ঠাকুরগাঁও বলতে শুরু করে। চক্রবর্তী বাবুরা এখানে একটি থানা স্থাপনের প্রয়োজন অনুভব করেন। তাদের অনুরোধে জলপাইগুড়ির জমিদার সেখানে একটি থানা স্থাপনের জন্য বৃটিশ সরকারকে রাজি করান। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে এখানে একটি থানা স্থাপিত হয়। আর তারনাম দেওয়া হয় ঠাকুরগাঁও থানা। পরবর্তীতে নানা কারণে টাঙ্গন নদীর পূর্ব তীরে নিশ্চিন্তপুরে ঠাকুরগাঁও থানা স্থানান্তরিত হয়। আর এই থানাকে কেন্দ্র করে ১০টি থানা নিয়ে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঠাকুরগাঁও মহকুমা গঠিত হয়। বর্তমান পঞ্চগড় জেলার ৫টি থানাই তখন ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্গত ছিল। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১লা ফেব্রুয়ারি ৫টি থানা নিয়ে এই ঠাকুরগাঁওয়ের নাম বাংলাদেশের মানচিত্রে চিহ্নিত হয় জেলারূপে। জেলারূপে নতুন হলেও জনপদ হিসেবে ঠাকুরগাঁওয়ের রয়েছে এক সুপ্রাচীন ইতিহাস।

নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

নৃতাত্ত্বিক বিচারে রাজবংশী কোন স্বতন্ত্র জাতি কিংবা কোচ ও মেচ জাতির সংমিশ্রনে উদ্ভূত কিনা এ ব্যাপারে মতদ্বৈততা রয়েছে। ইংরেজ ঐতিহাসিক এবং মানব বিজ্ঞানীগণের মধ্যে যেমন: ড: উইলিয়াম হান্টার, এইচ বিভারলে, এইচ এইচ রিজলী, এ.ই পোর্টার প্রভৃতির অভিমত হচ্ছে কোচ, রাজবংশী এবং পলিয়া মিশ্র জাতি কিনা এব্যাপারে সনেদহ থেকে যায়। নৃবিজ্ঞানী রমাপ্রসাদ চন্দের মতে তিববতীয় বা মঙ্গোলীয় আকারের কোচ, পলিয়া ও রাজবংশী প্রভৃতি জাতি তিববতীয় বা ভুটিয়া আক্রমণকারীগণের অনুচরদের বংশধর বলেই মনে হয়। নৃতাত্ত্বিক ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিচারে কোচ ও রাজবংশীকে দুই ভিন্ন জাতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন রংপুর ধর্মসভার সভাপতি যাদবেশ্বর তর্করত্ন। তিনি জানান, কোচ ও রাজবংশী দুইটি পৃথক জাতি। সকল কোচেরই মঙ্গোলীয় গড়ন। আদিম কোচ কৃষ্ণবর্ণ। পুজা বিষয়ে কোচ ও রাজবংশী জাতির মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ডক্টর হ্যামিল্টন ও স্যার রিজলী প্রমূখ নৃতত্ত্ববিদগণ উল্লেখ করেন যে, কোচ, পলিয়া ও রাজবংশী মূলত: একই গোষ্ঠীভূক্ত তিনটি শাখামাত্র।

রাজবংশীরা বর্তমানে নিজেদের কোচ জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে পরিচয় দিতে অস্বীকার করে। আসলে এদের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। কোচ ও রাজবংশীরা উভয়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজভূক্ত হলেও ধর্মীয় অনুরক্তিতে কোচরা শৈব প্রভাবিত; পক্ষান্তরে রাজবংশীরা বৈষ্ণব ভাবাপন্ন। কোচ রমনীরা এক কালে শিবপূজায় পৌরহিত্য করতো বলে শিবকে কোচ নারীদের প্রতি আসক্ত বলে বিশ্বাস করা হতো। ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ কথাটিও সম্ভবত কোচ নারীদের কাছ থেকেই প্রসার লাভ করেছে।

কোচ ও রাজবংশীদের উৎপত্তির ইতিহাসটিও এ প্রসঙ্গে জেনে নেয়া যায় । প্রাচীন কামরূপ রাজ্য অহোম ও কোচ জাতি দ্বারা অধিকৃত হয়। অহোমরা পূর্ব কামরূপ এবং কোচরা পশ্চিম কামরূপ (বর্তমান কোচবিহার, রংপুর ও পঞ্চগড়ের কিয়দংশ) দখল করে নেয়। পরিশেষে কোচরা কেন্দ্রীভূত হয় কোচবিহার ও বৈকুন্ঠপুরে। কোচদের প্রধান ও প্রথম নায়কের নাম ‘হাজো’। তিনি খেন জাতিদের হারিয়ে ১৪৯৬ খ্রীষ্টাব্দে কোচ রাজবংশের সৃষ্টি করেন এবং ৪৪০ বৎসর পর্যন্ত রাজত্ব করেন তার উত্তরসূরীগণ। ‘হাজো’ ছিলেন ‘বোডো’ জাতির মানুষ। ‘বোডো’ জাতি পাটকই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের কূল ধরে উত্তরপূর্ব আসামে এসে পৌঁছেছিলেন। আসামের পশ্চিমভাগ ও নেপালের তরাইভূমির পূর্বভাগ হাজোর অধীনে ছিলো।

কোচনায়ক হাজোর দৌহিত্র শিশু ও বিশু শিশ্বসিংহ ও বিশ্বসিংহ নাম ধারণ করে যথাক্রমে-বৈকুষ্ঠপুর (জলপাইগুড়ি) ও কোচবিহারের রাজা হন। এই ভাবে দুই ভাই উপজাতির পর্যায় থেকে রাজার পর্যায়ে উন্নীত হন এবং হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে নিজেদের প্রচার করতে থাকেন ‘রাজবংশী’ নামে। এইভাবে তাদের ‘কোচ’ নাম ঘুচে গেলো। রাজবংশীরা এখন নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে দাবী করে থাকেন। কিন্তু নৃবিজ্ঞানী এইচ.এইচ. রিজলী বলেন যে, তাদের এই দাবীর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এইচ বিভারলি ১৮৭২ সালের ‘Census Report of Bengal’  এর প্রথম খন্ডে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, কোচ রাজবংশী এবং পলিয়া একই জাতি ড. জি.এ গ্রীয়ার্সন মনে করেন কোচ, মেচ, বোডো একই জাতির বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন, বড়জোর একই জাতির মধ্যে কিছুটা স্বতন্ত্রধর্মী। কোচরা আসলে হিন্দু বৈশিষ্ট্যজাত বোডো সম্প্রদায়। তারা প্রাচীন ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য হিন্দু ধর্মে বিসর্জন দিয়েছে এবং প্রাচীন বোডো ভাষা আত্মীকৃত করেছে আসামী ও বাংলা ভাষার মধ্যে ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ মানুষ বোডো অর্থাৎ মিশ্র অস্ট্রিক-দ্রাবিড়-মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীভুক্ত। তারা প্রধানত এখন ‘কোচ’ নামেই পরিচিত এবং বর্তমানে হিন্দু বা প্রায় হিন্দু ধর্মের অর্ন্তভূক্ত। সেই সঙ্গে এরা মূল তিবেতো বার্মিজ ভাষা হারিয়ে এখন ব্যবহার করছে উত্তরবঙ্গীয় উপভাষা।

ঠাকুরগাঁ জেলায় বর্তমানে মোটামুটি ৫০ হাজার কোচ, ১ লক্ষাধিক রাজবংশী এবং ৬০/৭০ হাজার পলিয়া জনগোষ্ঠী বসবাস করে থাকে। এ জেলার লৌকিক ধর্ম বিশ্বাস, প্রথা, উৎসব এবং সাংস্কৃতিক পরিচর্চায় এই তিন জনগোষ্ঠীর অবদান সর্বাধিক। অনুমান করা হয় যে, এদের মধ্য থেকেই ইসলাম ধর্মান্তরকরণ প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশী সম্পন্ন হয়েছে।

নৃবিজ্ঞানী রিজলীর পরিমাপে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর গড় নৃ-বৈশিষ্ট্য জ্ঞাপক সূচকাঙ্ক হলো শিরাঙ্ক ৭৮.০ সে:মি:, নাসাংক ৭৭.৫ সে:মি এবং উচ্চতা ১৬৩.৪ সে:মি। পক্ষান্তরে গবেষক গৌতম শংকর রায় দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি এলাকার রাজবংশীদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করেছেন এভাবে-শিরাঙ্ক ৭৫.৮ সে:মি: নাসাংক ৭২.৪ সে:মি: এবং উচ্চতা ১৬০.৩ সে:মি:।

বস্ত্তত, পার্শ্ববর্তী এলাকা হিসেবে ঠাকুরগাঁ জেলার রাজবংশীদের নৃ-বৈশিষ্ট্যও প্রায় অনুরূপ। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মতো এ জেলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর নৃবৈশিষ্ট্য জ্ঞাপক সুচকাঙ্কও কম বেশী একই রকম। সুতরাং আদিবাসী, উপজাতি অধ্যুষিত এবং বহিরাগত জনধারার সংমিশ্রনে গড়ে উঠা ঠাকুরগাঁও জেলার নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়কে এভাবে সূত্রবদ্ধ করা চলে যে, এ জেলার মানবধারা মূলতঃ ‘মিশ্র অস্ট্রিক-মঙ্গোলীয় অ্যালপাইন’ নরগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।

অর্থনীতি

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ (সর্বশেষ মে, ২০২১ সালে প্রকাশিত) অনুযায়ী বাংলাদেশে গম উৎপাদনে শীর্ষ জেলা ঠাকুরগাঁও। ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী ঠাকুরগাঁও এ গমের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১,৭৫,৬৬৯ মেট্রিক টন যা ঢাকা অথবা খুলনা বিভাগের সবগুলো জেলায় মোট উৎপাদিত গমের তুলনায় অধিক। খাদ্যশস্য গমের অধিক ফলনের কারণে ঠাকুরগাঁও-কে বাংলাদেশের রুটির ঝুড়ি বলা হয়।

শিল্প

শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঠাকুরগাঁও চিনি কল অন্যতম। এছাড়া জেলায় বিসিক শিল্প নগরী আছে; সেখানে কিছু কারখানা আছে। এরমধ্যে বিস্কুট ফ্যাক্টরী, সাবান ফ্যাক্টরী, প্লাস্টিক কারখানা, ফ্লাওয়ার মিল এবং জুট মিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও সালন্দর ইউনিয়নে কাজী ফার্মস এর ফীড মিল আছে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৬ সালে যুদ্ধত্তোর জনগণের বিশেষ করে অসহায় মহিলা ও পুরুষদের পূর্নবাসন ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে একটি বেসরকারী সংস্থা RDRS কর্তৃক ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ১৯৮১ সালের ৩০ জুন সরকারি সিদ্ধান্তে অলাভজনক ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানাটি রেশম বোর্ডের নিকট হস্তান্তরিত হয়৷ এ সময় কারখানাটিতে ২০টি রিলিং বেসিন, ৩টি শক্তিচালিত তাঁত, ১৯টি হস্তচালিত তাঁত ও আনুসংগিক যন্ত্রপাতি সংস্থাপিত ছিল ৷ কারখানাটির চলতি মুলধন না থাকায় কারখানা পরিচালনার যাবতীয় অর্থ বোর্ডের উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ হিসেবে প্রদান করা হয়েছে৷ ১৯৯৬ হতে ১৯৯৯ সালে ১৬৩.৫৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বিএমআরই প্রকল্পের অধীনে কারখানাটির ভবন বর্দ্ধিতকরণসহ অতিরিক্ত ২০টি শক্তিচালিত তাঁতসহ কিছু আনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি সংস্থাপিত হয়৷ কিন্তু আবর্তক তহবিলের অভাবসহ নানাবিধ কারণে কারখানাটি পরিচালনা সম্ভব হয়নি৷ ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করে কর্মরত ৮৬ জন জনবলকে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে চাকরি হতে অব্যাহতি প্রদান করা হয় ৷ রেশম কারখানাটির উৎপাদন কখনই লক্ষ্যমাত্রায় পৌছতে পারেনি৷ কারখানা হতে আয় দ্বারা কখনই ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয়নি৷ ফলে এটি একটি লোকসানমূখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে পড়ে৷ কারখানাটিতে ফেব্রুয়ারি’২০০২ হতে নভেম্বর’২০০২ পর্যন্ত ১০ মাস শ্রমিকরে মজুরি প্রদান সম্ভব হয়নি৷ এ পর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্তে কারখানাটি বন্ধ ঘোষিত হয়৷

ভাষা

ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের স্থানীয় জনগণ সাধারণত কোচ রাজবংশীয় ভাষায় কথা বলে। এ ভাষাটি মূলত রাজবংশী, রংপুরী বা কামতাপুরী নামে পরিচিত যা ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত একটি ভাষা। শুদ্ধ ভাষার সাথে ঠাকুরগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষার বেশ পার্থক্য রয়েছে।যেমনঃ আমার মোর/হামার, আপনি/আপনার কে তুই,তোমা বলে থাকে। শ্রুতিমধুর এ ভাষা বাংলাদেশের দিনাজপুর, রংপুর অঞ্চলের মানুষ ছাড়াও ভারতের কোচবিহারের মানুষের মুখেও ব্যাপক প্রচলিত। রাজবংশী ভাষার কথ্যরূপগুলোর মধ্যে ৭৭-৮৯% মিল পাওয়া যায়। রাজবংশী ভাষা ৪৮-৫৫ ভাগ বাংলা, ৪৩-৪৯ ভাগ মৈথিলি এবং নেপালি শব্দ দ্বারা গঠিত।